+
ভবনের দোতলা থেকে আগুন ছড়ায়
ভবনের দোতলা থেকে আগুন ছড়ায়

ভবনের দোতলা থেকে আগুন ছড়ায়

বিস্ফোরণের বিকট শব্দের সঙ্গে সঙ্গে চারতলা ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলার দেয়াল ভেঙে পড়ছিল। দোতলা থেকে বোমার মতো ছিটকে পড়ছিল সুগন্ধির ক্যানগুলো। ওই মুহূর্তে চকবাজারের চুড়িহাট্টা মোড়ে যানজটে আটকা পড়া এবং বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

 

পুড়ে যাওয়া ওয়াহেদ ম্যানশনের পাশের ভবনের নিচতলার ‘রাজমহল’ হোটেলের একটি সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, ২০ ফেব্রুয়ারি রাত ১০টা ৩২ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে বিস্ফোরণের ঘটনাটি ঘটেছে। ওই সময় আগুন ওপর থেকে নিচের দিকে ছড়াচ্ছিল এবং সুগন্ধির ক্যানগুলো ছিটকে পড়ছিল।

 

পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টা মোড়ে এই ভয়াবহ বিস্ফোরণে ৬৭ জন মারা যান। ঘটনার পরপরই বিস্ফোরণের উৎস ও কারণ নিয়ে নানা বক্তব্য আসতে থাকে। চুড়িহাট্টা মোড়ে বিদ্যুতের কোনো ট্রান্সফরমার না থাকলেও সেখান থেকে আগুনের উৎপত্তি হয়েছিল বলে দাবি করেন কেউ কেউ। কেউ বলেন, ওয়াহেদ ম্যানশনের সামনে থাকা একটি পিকআপ হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়ে ওপরে ওঠে। এরপর আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আর এলাকার বাড়ির মালিক ও ব্যবসায়ীরা এককাট্টা হয়ে দাবি করে যাচ্ছেন, যানজটে আটকা একটি পিকআপের ওপর থাকা এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

 

তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ও ঘটনাস্থলের আলামত দেখে তদন্তকারী বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা মনে করছেন, আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলা থেকে। ওই তলায় সুগন্ধির ক্যান ও বাল্বের গুদাম ছিল। লাইটার রিফিল করার ক্যানও সেখানে পাওয়া গেছে।

 

অগ্নিকাণ্ডের পর শুক্র ও শনিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক শামসুল আলম। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, রাসায়নিক গুদাম ও সিলিন্ডার—এ দুটি বিষয় সামনে রেখে তাঁরা তদন্ত শুরু করেছেন। এ দুটি বিষয়ই তাঁরা বিবেচনায় রেখেছেন। সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কোনো আলামত এখন পর্যন্ত তাঁরা পাননি। সে ক্ষেত্রে রাসায়নিক বিস্ফোরণেই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে।

 

শামসুল আলম বলেন, ঘটনাস্থলে কিছু মানুষ এমন ঝামেলা করছে যে খুব সাবধানে তদন্তটি করতে হচ্ছে। আশপাশের ব্যবসায়ীরা বারবার সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কথা বলছেন। ঘটনাস্থলে তিনি একটি টিভি চ্যানেলকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় ব্যবসায়ীরা বারবার ‘সিলিন্ডার সিলিন্ডার’ চিৎকার করছিলেন। বিস্ফোরণটি ওয়াহেদ ম্যানশনের ভেতর থেকে হয়েছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করব না। একজন এক্সপার্ট হিসেবে আমার একটা ধারণা হয়েছে। তবে পর্যাপ্ত তথ্য–প্রমাণ দিয়ে বিষয়টি তদন্ত প্রতিবেদনে তুলে ধরব।’

 

রাজমহল হোটেলের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ছাড়াও ঘটনাস্থলের পাশের শেখ হায়দার বক্স লেনের আরেকটি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে পুলিশ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি। দুটি ফুটেজ দেখার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির এক সদস্য নাম না প্রকাশের শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ভবনের সামনের রাস্তা থেকে আগুনের সূত্রপাতের যে কথা বলা হচ্ছে, এর পেছনে কোনো যুক্তি খুঁজে পাচ্ছেন না তাঁরা।

 

বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে দেয়াল ভেঙে পড়ে

 

বুধবার রাতে দেবীদাস ঘাটের বাসা থেকে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের কাছে সাগুন কমিউনিটি সেন্টারে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে মোটরসাইকেলে করে যাচ্ছিলেন শাহাদাত হোসেন। সঙ্গে ছিল তাঁর ১৩ বছরের ছেলে শাফিন। চুড়িহাট্টা মোড়ে আসার পরপরই তিনি যানজটে আটকা পড়েন। ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কমিটির কাছে গতকাল নিজের বক্তব্য দিয়েছেন শাহাদাত। এরপর ঘটনাস্থলে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে তাঁর কথা হয়। শাহাদাত বলছিলেন, মোটরসাইকেল নিয়ে ওয়াটার ওয়ার্কস সড়ক দিয়ে তিনি চুড়িহাট্টা মোড়ের দিকে এগোচ্ছিলেন। সড়কটি ওয়াহেদ ম্যানশনের দক্ষিণ সীমানা ঘেঁষে। মোড়ের ৮-১০ ফুট আগে যানজটে পড়ার কারণে তিনি আর এগোতে পারছিলেন না। এ সময় হঠাৎ ওয়াহেদ ম্যানশনের সামনের দিক থেকে আগুনের ঝলসানো আলো তাঁর চোখে ধাক্কা দেয়। মুহূর্তেই ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলার দেয়াল তাঁর পাশে ভেঙে পড়তে থাকে। ইটের টুকরা তাঁর শরীরে ও ছেলের মাথায় এসে পড়ে। চোখের পলকে মোটরসাইকেলটি ফেলেই ছেলেকে নিয়ে তিনি দৌড় দেন। তখন আশপাশের লোকেরাও নিজেদের ভেতরে রেখে দোকানের শাটার লাগিয়ে দিচ্ছিলেন। তাঁদের প্রায় সবাই দোকানের ভেতরে মারা গেছেন।

 

আগুনের ‘গোলা’ উড়ে এসে পড়ে

 

বিস্ফোরণের সময় ওই দিন শান্তিনগর থেকে নিজের টয়োটা অ্যাকুয়া হাইব্রিড গাড়িতে করে চকবাজারের বাসায় ফিরছিলেন আবাসন ব্যবসায়ী মাহবুবুর রহমান। বকশীবাজার দিয়ে শেখ আজগর লেন হয়ে তিনি চুড়িহাট্টা মোড়ে পৌঁছে দু–তিন মিনিট যানজটে আটকা পড়েন। ঠিক তখনই আগুনের কবলে পড়েন। তাঁর গাড়িটি পুড়ে গেছে।

 

মাহবুবুর রহমানের গাড়িটি মোড়ের একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির পাশে ছিল। ঘটনার পরপর কারও কারও ভাষ্য ছিল এমন যে ওই গাড়িটি বিস্ফোরিত হয়ে বিদ্যুতের ট্রান্সফরমারে লাগে। এরপর আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। মাহবুবুর রহমান গতকাল ঘটনার বর্ণনা দিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, গাড়িটি চালাচ্ছিলেন চালক ইউসুফ। তিনি পাশে বসে ছিলেন। মোড়ে যানজটে আটকা পড়ার পর হঠাৎ বিস্ফোরণের বিকট শব্দ পান। এরপর ওপর থেকে আগুনের ‘গোলা’ এসে গাড়ির সামনের অংশে পড়লে মুহূর্তেই আগুন ধরে যায়। তিনি পাশের দরজা খুলে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু দরজাটি তখন খুলছিল না। পাশ ফিরে দেখেন গাড়িচালক তাঁর দরজা খুলে বের হতে পেরেছেন। তখন তিনিও কোনোরকমে চালকের দরজা দিয়ে বের হয়ে আসেন। ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কমিটিকেও একই বর্ণনা দিয়েছেন তিনি।

 

এক এলাকাবাসীর মামলা

 

হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনের মালিক মো. হাসান (৫০) ও সোহেল ওরফে শহীদকে (৪৫) আসামি করে ঘটনার পরদিন চকবাজার থানায় হত্যা মামলা করেন মো. আসিফ নামের এক এলাকাবাসী। এই আগুনে তাঁর বাবা জুম্মন মারা গেছেন। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি এজাহারে লিখেছেন, ‘২০ ফেব্রুয়ারি রাত ১০টা ২০ মিনিটে চুড়িহাট্টা শাহি জামে মসজিদের সামনে রাস্তায় চলাচলরত একটি প্রাইভেট কারের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে পাশের বিদ্যুতের ট্রান্সমিটারে আগুন লেগে যায়। তৎক্ষণাৎ পাশে আরেকটি প্রাইভেট কারে আগুন লাগলে সেই গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়। ৬৫/৬৬ নন্দকুমার দত্ত রোডের চুড়িহাট্টা বিল্ডিংয়ের সামনে একটি পিকআপে থাকা গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে রাজমহল হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে আগুন লাগে। সেখান থেকে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে সমগ্র এলাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে।’

 

এ ধরনের বর্ণনা মূলত এলাকার ব্যবসায়ী ও বাড়ির মালিকেরা দিয়ে আসছেন। বাস্তবে এই বর্ণনার কোনো সত্যতা পায়নি কোনো তদন্ত কমিটি বা গণমাধ্যম। রাজমহল হোটেলের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখেও তা মনে হয় না। বৈদ্যুতিক খুঁটির পাশে থাকা কারের মালিক মাহবুবুর রহমান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, উড়ে আসা একটি আগুনের ‘গোলা’ থেকে তাঁর গাড়িতে আগুন লেগেছিল। গাড়িটি অকটেন চলত।

 

সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে দেখা যায়, রাজমহল হোটেলে কোনো বিস্ফোরণের ঘটনাই ঘটেনি। এ ছাড়া ডিপিডিসির লালবাগ অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী হরিচাঁদ হালদার বলেন, চুড়িহাট্টা মোড়ে বিদ্যুতের কোনো ট্রান্সফরমার ছিল না।

 

মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শামীমুর রশীদ তালুকদার বলেন, ঘটনার পর পুলিশ বাদী হয়ে অপমৃত্যুর মামলা করেছিল। কিন্তু হত্যা মামলাটি হওয়ার পর অপমৃত্যুর মামলাটি আর থাকবে না। হত্যা মামলার ভিত্তিতে পুরো ঘটনার তদন্ত হবে।

 

রাসায়নিক গুদাম সরানোর ঘোষণা

 

শুক্রবার ওয়াহেদ ম্যানশনের ভূগর্ভস্থ তলায় পাওয়া বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক দ্রব্য গতকাল সরিয়ে ফেলেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। মেয়র সাঈদ খোকন নিজে উপস্থিত হয়ে এ কাজ শুরু করেন। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, তাঁরা ভেতরে গিয়ে ভূগর্ভস্থ গুদামটি দেখেছেন। সেখানে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক দ্রব্য রয়েছে। এগুলো অপসারণের মধ্য দিয়ে পুরান ঢাকার পুরো এলাকায় যত রাসায়নিক গুদাম আছে সব অপসারণের কার্যক্রম শুরু হলো। কোনো বাড়ির মালিক রাসায়নিক থাকার তথ্য না দিলে এবং পরে যদি পাওয়া যায়, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

রাসায়নিকের গুদাম অপসারণ কার্যক্রম শুরু করে চলে যাওয়ার সময় মেয়রের পথরোধ করে বিক্ষোভ করেন স্থানীয় লোকজন। ‘শুধু কেমিক্যাল অপসারণ নয়, গ্যাস সিলিন্ডারও অপসারণ করুন, করতে হবে’ এমন স্লোগান দিতে থাকেন তাঁরা।



Published: 2019-02-24 16:01:02