+
ফেনীতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে নুসরাতের লাশ
ফেনীতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে নুসরাতের লাশ

ফেনীতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে নুসরাতের লাশ

নিপীড়নের প্রতিবাদ করতে গিয়ে ফেনীর সোনাগাজী ইসলামী সিনিয়র মাদ্রাসা অধ্যক্ষের লোকজনের দেয়া আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া নুসরাত জাহান রাফির লাশের ময়নাতদন্ত শেষ হয়েছে। লাশ বুঝে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল থেকে ফেনীর সোনাগাজীর উদ্দেশে রওনা হয়েছে তার পরিবার।

বৃহস্পতিবার বাদ আসর সোনাগাজী সাবের সরকারি পাইলট হাইস্কুল মাঠে নুসরাতের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর পারিবারিক কবরস্থানে দাদির কবরের পাশে তাকে দাফন করা হবে।পরিবারের পক্ষ থেকে তার দাফনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।

নুসরাতের চাচা নুরুল হুদা শামীম জানান, পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আজ তাকে দাফন করা হবে। বাদ আসর সোনাগাজী সাবের পাইলট হাইস্কুল মাঠে জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।

নুসরাতকে দেখার জন্য সকাল থেকে তার বাড়িতে ভিড় করেছেন গ্রামবাসী।বাড়িতে চলছে শোকের মাতম।

এর আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ময়নাতদন্ত শুরু হয়ে শেষ হয় ১২টায়। তিন সদস্যের মেডিকেল বোর্ড ময়নাতদন্তে অংশ নেয়।

ময়নাতদন্ত করেন নুসরাতের ময়নাতদন্তের জন্য গঠিত বোর্ডের প্রধান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. সোহেল মাহমুদ। তার সঙ্গে ছিলেন বোর্ডের দুই সদস্য প্রভাষক ডা. প্রদীপ বিশ্বাস ও প্রভাষক ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস।

ময়নাতদন্ত শুরুর আগে ডা. প্রদীপ বিশ্বাস জানিয়েছিলেন, সকালেই নুসরাতের লাশ হিমঘর থেকে মর্গে নেয়া হয়েছে। বেলা সোয়া ১১টার দিকে পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদন তাদের হাতে আসে। এর পর ময়নাতদন্ত শুরু করেন তারা। ময়নাতদন্ত শেষে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থেকে লাশ বুঝে নেন নুসরাতের বাবা একেএম মুসা মানিক।

এর আগে নুসরাতের লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সুরতহাল প্রতিবেদন লিখেন শাহবাগ থানার এসএই শামসুর রহমান। তিনি বলেন, সুরতহাল শেষ হয়েছে। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের পরামর্শের কথা উল্লেখ করা আছে সুরতহাল প্রতিবেদনে।

সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরিকালে এসএই শামসুর রহমানের সঙ্গে হাসপাতালে এএসআই মিনারা খাতুন ও কনস্টেবল মো. রমজান আলী উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে বুধবার রাত সাড়ে ৯টায় না ফেরার দেশে চলে যান ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি (১৮)। চিকিৎসকদের প্রাণপণ চেষ্টার পরও তাকে বাঁচানো গেল না। টানা ১০৮ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে হার মানেন এই ছাত্রী।

হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের চিকিৎসক অধ্যাপক রায়হানা আউয়াল যুগান্তরকে জানান, মৃত্যুর আগে তিনি লাইফসাপোর্টে ছিলেন।

লাইফসাপোর্টে যাওয়ার আগেও রাফি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। দগ্ধ হওয়ার আগে দুই বান্ধবীর কাছে লেখা চিঠিতে তিনি ঘটনার শেষ দেখার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। কিন্তু তার শেষ দেখা হলো না। এর আগেই নিভে গেল জীবনপ্রদীপ। রাতে তার মরদেহ হিমঘরে রাখা হয়।

নুসরাত জাহান রাফির চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান ও শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম জানান, বুধবার সকাল থেকে নুসরাতের অবস্থার অবনতি হতে থাকে। একাধিকবার তার হার্ট অ্যাটাক করেছিল, তারপরও সে বেঁচে ছিল। কিন্তু রাত সাড়ে ৯টার দিকে মারা যায়।

প্রসঙ্গত ৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজীতে পরীক্ষাকেন্দ্রের ভেতর ওই ছাত্রীর গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে হত্যাচেষ্টা চালায় দুর্বৃত্তরা। শনিবার সকালে সোনাগাজী পৌর এলাকার ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসাকেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। ওই ছাত্রী ওই মাদ্রাসা থেকেই আলিম পরীক্ষা দিচ্ছিলেন।

পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত কক্ষ থেকে ছাদে ডেকে নিয়ে কয়েকজন বোরকাপরা নারী পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ করেছেন ওই শিক্ষার্থীর পরিবারের সদস্যরা। তারা জানান, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগে দায়ের করা মামলা তুলে না নেয়ায় এ ঘটনা ঘটেছে। এ তথ্য ফেনী সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্থানীয় পুলিশকেও জানিয়েছেন ওই শিক্ষার্থী। তার অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় এদিন বিকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের ১০২ নম্বর কক্ষে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়।তাকে লাইফসাপোর্ট দেয়া হয়েছে। শ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক করতে মঙ্গলবার তার অস্ত্রোপচারও হয়। অস্ত্রোপচারের পরও তাকে নিয়ে শঙ্কা কাটেনি বলে জানিয়েছিলেন চিকিৎসকরা।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগে মামলা করেন ওই ছাত্রীর মা। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ২৭ মার্চ সকাল ১০টার দিকে অধ্যক্ষ তার অফিসের পিয়ন নূরুল আমিনের মাধ্যমে ছাত্রীকে ডেকে নেন। পরীক্ষার আধাঘণ্টা আগে প্রশ্নপত্র দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ওই ছাত্রীর শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন অধ্যক্ষ। পরে পরিবারের দায়ের করা মামলায় গ্রেফতার হন অধ্যক্ষ। সেই মামলা তুলে না নেয়ায় অধ্যক্ষের লোকজন ওই ছাত্রীর গায়ে আগুন দিয়েছে।

এদিকে ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে গ্রেফতার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিকেএম এনামুল করিমের সভাপতিত্বে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসার গভর্নিং কমিটির সভায় রোববার এ সিদ্ধান্ত হয়। সভায় ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত মাদ্রাসা বন্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্ত হয়।

সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলাকে শিশু বলাৎকারের ঘটনায় ফেনী সদরের একটি মাদ্রাসা থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে নাশকতা, যৌন হয়রানি ও চেক জালিয়াতিসহ ফেনী এবং সোনাগাজী মডেল থানায় ছয়টি মামলা রয়েছে।



Published: 2019-04-11 14:13:10