+
দগ্ধ ছাত্রীর শংকা কাটেনি অস্ত্রোপচারের পরও
দগ্ধ ছাত্রীর শংকা কাটেনি অস্ত্রোপচারের পরও

দগ্ধ ছাত্রীর শংকা কাটেনি অস্ত্রোপচারের পরও

ফেনীর সোনাগাজীতে পরীক্ষাকেন্দ্রে দুর্বৃত্তদের দেয়া আগুনে দগ্ধ মাদ্রাসাছাত্রীর অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। লাইফসাপোর্টে রেখে মঙ্গলবার দুই ঘন্টাব্যাপী এই অস্ত্রোপচার করা হয়।এই অস্ত্রোপচারে তার শ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক হলে শংকা কাটেনি বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। মাদ্রাসাছাত্রীর স্বাস্থ্যের বিষয়ে বুধবার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, ওর অবস্থা আগের মতোই আছে। সে এখনও শঙ্কামুক্ত নয়। আজকে আমরা আবার সিঙ্গাপুর তার চিকিৎসার বিষয়ে কথা বলব।

বার্ন ইউনিটের অধ্যাপক ডা. রায়হানা আওয়াল সুমি যুগান্তরকে বলেন, অগ্নিদগ্ধ ছাত্রীর শরীরের বিভিন্ন অংশ মারাত্মকভাবে পুড়ে ভেতরের দিকে ঢুকে গেছে। তার শিরা-উপশিরায় রক্ত চলাচলে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফুসফুস ও কিডনি কাজ করতে পারছে না। আমরা দেবে যাওয়া স্থানগুলো কেটে দিয়েছি। ফুসফুস একেবারেই ওঠানামা করতে পারছে না। অগ্নিদগ্ধ শিক্ষার্থীর ফুসফুস সক্রিয় করতে অস্ত্রোপচারের পর মঙ্গলবার দুপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ডিএমসিএইচর পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিন ও ডিএমসিএইচের বার্ন ইউনিটের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক আবুল কালাম।

 একেএম নাসির উদ্দিন বলেন, ‘অগ্নিদগ্ধ মাদ্রাসাছাত্রীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে সোমবার তাকে লাইফসাপোর্টে নেয়া হয়। লাইফসাপোর্টে রেখেই তার অস্ত্রোপচার হয়েছে। সকালে আমাদের চিকিৎসকরা সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলেছেন। সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে। সার্বক্ষণিক আপডেট তাদের জানানো হচ্ছে। মেয়েটির শরীরের ৭০ শতাংশ ‘ডিপ বার্ন’। তার একটা অস্ত্রোপচার হয়েছে। এখন তার অবস্থার উন্নতি হবে বলে আশা করছি।‘আমরা সব সময় প্রত্যাশা করি রোগী ফিরে আসবে। এ ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রত্যাশা করছি। এই রোগীর ক্ষেত্রে বেশ কিছু জটিলতা থাকলেও সৃষ্টিকর্তা সহায় থাকলে অনেক কিছুই সম্ভব।’ অগ্নিদগ্ধ ছাত্রীর সুস্থতায় তিনি দেশবাসীকে প্রার্থনা করার অনুরোধ জানিয়েছেন।

এর আগে মঙ্গলবার সকাল ৯টায় মাদ্রাসাছাত্রীর চিকিৎসার বিষয়ে সিঙ্গাপুরের জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে মেডিকেল বোর্ড। এর পরই ওই ছাত্রীর অস্ত্রোপচার করা হয়। লাইফসাপোর্টে রেখেই দুই ঘণ্টাব্যাপী এ অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচার শেষে মেডিকেল বোর্ডের প্রধান ও হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম জানান, সফল অপারেশন হয়েছে। এখন শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারছেন ওই ছাত্রী। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন যুগান্তরকে জানান, ওর শ্বাসনালি পুড়ে গেছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। সে যাতে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারে, সে জন্য এই অস্ত্রোপচার করা হয়েছে।

এই অস্ত্রোপচারকে (escharatomy) এসকারাটমি বলে উল্লেখ করেন ডা. আবুল কালাম। তিনি বলেন, আমরা আগেই বলেছিলাম তার অস্ত্রোপচার করা লাগবে। সকালে আমরা সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারাও আমাদের মেডিকেল বোর্ডের অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্তে একমত পোষণ করেছেন। উভয় সিদ্ধান্তক্রমে ওই ছাত্রীর অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে।

ডা. আবুল কালাম জানান, এখন ওই ছাত্রী গতকালের থেকে একটু ভালো আছে। বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে লাইফসাপোর্টে আছেন তিনি। অস্ত্রোপচারের তথ্য ও বর্তমান শারীরিক অবস্থার আপডেটসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ফের সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। মঙ্গলবার সকালে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্স শেষে ডা. সামন্ত লাল সেন জানান, ওই ছাত্রীকে এখনই সিঙ্গাপুরে নেয়া যাবে না।

তিনি বলেন, ওর অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় এ মুহূর্তে সিঙ্গাপুরে নেয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। সিঙ্গাপুরে নিতে গেলে জার্নিতে যে ধকল থাকবে, সেটি সামাল দেয়ার মতো অবস্থায় নেই সে। তাই তাকে আপাতত বার্ন ইউনিটেই চিকিৎসা দেয়া হবে। অবস্থার উন্নতি হলে তখন বিদেশ নেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। প্রসঙ্গত ফেনীর সোনাগাজীতে পরীক্ষাকেন্দ্রের ভেতর ওই ছাত্রীর (১৮) গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে হত্যাচেষ্টা চালায় দুর্বৃত্তরা। শনিবার সকালে সোনাগাজী পৌর এলাকার ইসলামিয়া সিনিয়ার ফাজিল মাদ্রাসাকেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। ওই ছাত্রী ওই মাদ্রাসা থেকেই আলিম পরীক্ষা দিচ্ছিলেন।

পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত কক্ষ থেকে ছাদে ডেকে নিয়ে কয়েকজন বোরকাপরা নারী পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ করেছেন ওই শিক্ষার্থীর পরিবারের সদস্যরা। তারা জানান, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগে দায়ের করা মামলা তুলে না নেয়ায় এ ঘটনা ঘটেছে। এ তথ্য ফেনী সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্থানীয় পুলিশকেও জানিয়েছেন ওই শিক্ষার্থী। তার অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় এদিন বিকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের ১০২ নম্বর কক্ষে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগে মামলা করেন ওই ছাত্রীর মা। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ২৭ মার্চ সকাল ১০টার দিকে অধ্যক্ষ তার অফিসের পিয়ন নূরুল আমিনের মাধ্যমে ছাত্রীকে ডেকে নেন। পরীক্ষার আধাঘণ্টা আগে প্রশ্নপত্র দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ওই ছাত্রীর শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন অধ্যক্ষ। পরে পরিবারের দায়ের করা মামলায় গ্রেফতার হন অধ্যক্ষ। সেই মামলা তুলে না নেয়ায় অধ্যক্ষের লোকজন ওই ছাত্রীর গায়ে আগুন দিয়েছে।

এদিকে ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে গ্রেফতার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিকেএম এনামুল করিমের সভাপতিত্বে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসার গভর্নিং কমিটির সভায় রোববার এ সিদ্ধান্ত হয়। সভায় ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত মাদ্রাসা বন্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্ত হয়। এছাড়া সভায় মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষকদের পক্ষ থেকে অগ্নিদগ্ধ ছাত্রীর চিকিৎসায় দুই লাখ টাকা অনুদান দেয়ারও সিদ্ধান্ত হয়। সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলাকে শিশু বলাৎকারের ঘটনায় ফেনী সদরের একটি মাদ্রাসা থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে নাশকতা, যৌন হয়রানি ও চেক জালিয়াতিসহ ফেনী এবং সোনাগাজী মডেল থানায় ছয়টি মামলা রয়েছে।



Published: 2019-04-10 12:05:35