+
আবরারকে চিৎকার দিয়ে কাঁদতেও দেয়া হয়নি
আবরারকে চিৎকার দিয়ে কাঁদতেও দেয়া হয়নি

আবরারকে চিৎকার দিয়ে কাঁদতেও দেয়া হয়নি

আবরার ফাহাদ মৃত্যুর আগে পানি চেয়েও পাননি। আবরার হত্যা মামলার আসামি মোজাহিদ জবানবন্দিতে এ কথা স্বীকারোক্তি দিয়েছেন ।

তিনি বলেন, আবরার পানি চাইলে তাকে পানি না দিয়ে হামলাকারী ছাত্রলীগ নেতা অনিক বলেন, ‘ও ভান করছে, আরও পেটালে ঠিক হয়ে যাবে।’ এরপর আবরারের ওপর শুরু হয় আবারও স্ট্যাম্প দিয়ে নির্যাতন করে তাকে মের মেরে ফেলা হয়।

আদালতে আসামিদের দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বুয়েটছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার আগে তার ওপর চলা শেষ চার ঘণ্টার অমানসিক নিযার্তনের বর্ণনার চিত্র এভাবেই ফুটে উঠেছে।

আবরার হত্যাকাণ্ডের পর যে ভিডিওফুটেজ প্রকাশ হয়েছে তাতে দেখা গেছে, ৬ ঘণ্টা পাশবিক নির্যাতন শেষে মৃতপ্রায় আবরারকে কোলে করে তুলে নিয়ে শেরেবাংলা হলের সিঁড়িতে ফেলে দেয়া হয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অমিত, অনিক, সকাল ও মুজাহিদদের জেরায় জানা গেছে কেন তারা আবরারকে এভাবে সিঁড়ি ফেলে রেখে চলে গিয়েছিল প্রথমে। শিবির বলে পুলিশ ডেকে ধরিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যেই আবরারকে সিঁড়ির কাছে নিয়ে যায় হত্যাকারীরা।

আদালতের জবানবন্দিতে সে কথা স্বীকার করেছে তারা। আবরারকে শিবির বলে ধরিয়ে ঝামেলা থেকে বেঁচে যেতে পুলিশও ডেকেছিল অমিতরা। কিন্তু আবরার মারা যাওয়ায় তাকে পুলিশে দেয়া সম্ভব হয়নি। রাত ৩টায় আবরার মারা যান।

সেদিন সদ্য বহিষ্কৃত ছাত্রলীগ নেতা অনিক সরকার এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে আবরারকে পিটিয়ে কক্ষ থেকে বের হয়ে যায়। রাত ১২টায় আবরার ভীষণ অসুস্থ হয়ে পর পর দুবার বমি করে। তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল।

অবস্থা বেগতিক দেখে মেঝেতে আবরারের মাথার নিচে বালিশ দেয় ইফতি। ইফতি ফোন করে অনিককে আবরারের অবস্থার কথা জানালে জবাবে ‘কিচ্ছু হবে না বলে আশ্বস্ত করে।

এসময় আবরার আবার বমি করলে বাধ্য হয়ে কয়েকজন ধরে তাকে ২০০৫ নম্বর কক্ষে নিয়ে শুইয়ে দেয়। এ সময় সেখানে আসে মেহেদী ও অনিক। আবরারকে দেখে মেহেদী বলে, ‘ও ঢং ধরেছে। ওর কিছু হয়নি। থেরাপি দিলেই ঠিক হয়ে যাবে।’

এ সময় আরও মেরে তথ্য বের করতে বলে এসএমএস পাঠায় অমিত। কিন্তু আবরারের অবস্থা খুব খারাপ জানালে অমিত তাকে হল থেকে বের করে দিতে বলে। মেহেদী তখন আবরারকে পুলিশের হাতে দেয়ার জন্য নিচে নামাতে বলে। কিন্তু আবরার তখন দাঁড়ানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে।

তার দেহ অসাড় হয়ে ঠাণ্ডা হতে থাকে। এ সময় মিজান পানি আনতে বললে পানি এনে আবরারকে খাওয়ানো হয়। পরে তোশকে করে মোয়াজ, তামিম ও জেমি দোতলা ও নিচতলার সিঁড়ির মাঝামাঝি রাখে আবরারকে।

আবরার তখন গোঙানির সুরে বলেন, ‘আমার খুব খারাপ লাগছে।’ আবরারের এমন অবস্থা দেখে ইসমাইল ও মনির তখন অ্যাম্বুলেন্সকে ফোন দেয়। অ্যাম্বুলেন্স আসতে দেরি হওয়ায় তামিম বাইক নিয়ে বুয়েট মেডিকেলের চিকিৎসককে নিয়ে আসে।

চিকিৎসক আসার পরপরই অ্যাম্বুলেন্স আসে। চিকিৎসক সিঁড়িতে আবরারকে দেখে বলেন, ‘ও মারা গেছে।’ আবরার হত্যা মামলায় পুলিশের হাতে গ্রেফতার বুয়েট ছাত্রলীগ নেতা মোজাহিদুল ইসলাম জবানবন্দিতে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

যারা আবরার হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নিয়েছে মোজাহিদুল ইসলাম তাদের অন্যতম। তিনি বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ও বুয়েট ছাত্রলীগের সদস্য ছিল।

ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ড করার পর তাকে জেলে পাঠানো হয়। এর আগে ডিবির কাছে কার্যবিধির ১৬১ ধারার জবানবন্দি দেয় সে। ৬ অক্টোবর আবরার খুন হওয়ার পরপরই যে ১০ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়েছিল, তাদের মধ্যে মোজাহিদ একজন।

এর আগে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে বুয়েটের ছাত্র ইফতি মোশাররফ সকাল, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন ও অনিক সরকার। এই চার আসামির জবানবন্দি অনুসারে, ৫ অক্টোবর সদ্য বহিষ্কৃত বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান ওরফে রবিন শেরেবাংলা হল ছাত্রলীগের মেসেঞ্জার গ্রুপে একটি নির্দেশনা দেয়।

সেই নির্দেশনার জবাবে ছাত্রলীগের উপআইন সম্পাদক অমিত সাহা লেখেন, ‘ওকে (আবরার) বাড়ি থেকে ফিরতে দেন।’এক দিন পর ৬ অক্টোবর বিকালে গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়া থেকে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে ফেরেন আবরার।

সেদিন রাত ৮টা ১৩ মিনিটে আবরারকে ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নিয়ে যায় তানিম, সাদাত, সাইফুল ও অভি। সঙ্গে আবরারের দুটি মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপও নেয় মুনতাসির আল জেমি।

আবরারের দুটি মোবাইল হাতে নিয়ে চেক করতে থাকে মুজতবা রাফিদ ও খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম ওরফে তানভীর। এ সময় কক্ষে আসে মেহেদী হাসান এবং বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক মো. মেফতাহুল ইসলাম ওরফে জিয়ন।

আবরার শিবির করে কিনা আর বুয়েটে কোন কোন শিক্ষার্থী শিবির করে তা জানতে চেয়েই আবরারকে কয়েকটি চড় মারে মেহেদী। তার দেখাদেভি ইফতিও চড়-থাপ্পড় মারতে থাকে।

একপর্যায়ে শামসুল আরেফিন ক্রিকেট স্টাম্প নিয়ে আবরারের ওপর হামলা চালায়। সেই স্টাম্প দিয়ে আবরারকে মারে অনিক। থেমে থেমে ইফতি, মেফতাহুল জিয়নসহ অন্যরা স্টাম্প দিয়ে পেটাতে থাকে আবরারকে। মারতে মারতে একসময় স্টাম্প ভেঙে ফেলে ইফতি।

এ সময় অনিক বলে, দেখ শিবির কীভাবে পেটাতে হয় আমার থেকে শিখে নে বলেই আরেকটি স্টাম্প নিয়ে লাগাতার আবরারকে পেটাতে থাকে অনিক। আবরারের হাঁটু, পায়ের তালু এবং পা ও বাহুতে মারতে থাকে সে।

এসময় আবরার চিৎকার করে কাঁদতেও পারেননি। কারণ অন্যরা আবরারের মুখ চেপে ধরে রেখেছিল। রাত সাড়ে ১০টার দিকে আবরারকে কক্ষে রেখে ইফতি, জিয়নসহ অন্যরা ক্যান্টিন থেকে খেয়ে এসে আবার পেটায় আবরারকে।

এ সময় মুজাহিদ তার কক্ষে থাকা প্লাস্টিকের মোটা দড়ি দিয়ে পেটায় থাকে আবরারকে। ইফতি আবার স্টাম্প হাতে নেয়। এবার আবরারের হাঁটু ও পায়ে আঘাত করে সে। তাবাখখারুল তখন চড়-থাপ্পড় মারে।

আবরার ফাহাদের মৃত্যুর বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ যুগান্তরকে জানিয়েছেন, নির্মম নির্যাতনের কারণে আবরারের শরীরে ব্যাপক ইন্টারনাল রক্তক্ষরণ হয়।

ব্যথা চলে গিয়েছিল সহ্যের বাইরে। এ দুই কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে। প্রসঙ্গত ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ায় খুন হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে।

ভারতের সঙ্গে চুক্তির বিরোধিতা করে শনিবার বিকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন ফাহাদ। এর জের ধরে রোববার রাতে শেরেবাংলা হলের নিজের ১০১১ নম্বর কক্ষ থেকে তাকে ডেকে নিয়ে ২০১১ নম্বর কক্ষে বেধড়ক পেটানো হয়।

এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পিটুনির সময় নিহত আবরারকে ‘শিবিরকর্মী’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালায় খুনিরা। তবে আবরার কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না বলে নিশ্চিত করেছেন তার পরিবারের সদস্যসহ সংশ্লিষ্টরা।

হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ না রাখতে সিসিটিভি ফুটেজ মুছে (ডিলিট) দেয় খুনিরা। তবে পুলিশের আইসিটি বিশেষজ্ঞরা তা উদ্ধারে সক্ষম হন। পুলিশ ও চিকিৎসকরা আবরারকে পিটিয়ে হত্যার প্রমাণ পেয়েছেন।

আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার বাবা বরকত উল্লাহ বাদী হয়ে চকবাজার থানায় ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ইতিমধ্যে পুলিশ ১৭ জনকে গ্রেফতার করেছেন। ১৩ জনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ।

গ্রেফতার আসামিরা হলেন- বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান ওরফে রাসেল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফুয়াদ হোসেন, অনীক সরকার, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, ইফতি মোশারেফ, বুয়েট ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান ওরফে রবিন, গ্রন্থ ও প্রকাশনা সম্পাদক ইশতিয়াক আহমেদ ওরফে মুন্না, ছাত্রলীগের সদস্য

মুনতাসির আল জেমি, খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম ওরফে তানভীর, মোহাজিদুর রহমানকে, শামসুল আরেফিন, মনিরুজ্জামান ও আকাশ হোসেন, মিজানুর রহমান (আবরারের রুমমেট), ছাত্রলীগ নেতা অমিত সাহা এবং হোসেন মোহাম্মদ তোহা। এদের মধ্যে ১৯ জনকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে।



Published: 2019-10-14 18:35:38